WhatsApp Icon

Blog h

Date: 13-08-2025, 11:23 pm

Author: সাঈদ আল মাহমুদ

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ:



পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ: 
আপনি কি বুঝে উঠতে পারছেন, আপনি যুদ্ধের ময়দানে আছেন?


সাঈদ আল মাহমুদ

এম এ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

সহকারী শিক্ষক, আল জামিয়া আস সালাফিয়া, রাজশাহী। 

প্রভোস্ট ও চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার, মুসলিম ইউনিভার্সিটি। 

  

আপনি কি কখনও এমনটা ভেবেছেন, কেন আজকাল মানুষ এত বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত বা বিভক্ত? কেন আমরা নিজেরাই নিজের শত্রু হয়ে উঠছি? এসবের পেছনে রয়েছে এক আধুনিক যুদ্ধের ধরন।যাকে বলা হয় ফিফথ জেনারেশন ওয়ারফেয়ার বা পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ।

আজকের দুনিয়ায় যুদ্ধ আর আগের মতো হয় না। আগের যুদ্ধ মানেই ছিল সেনাবাহিনী, বন্দুক, ট্যাংক, ঢাল তলোয়ার আর রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র। কিন্তু এখন যুদ্ধ হয় আরও সূক্ষ্ম, নিঃশব্দ এবং অদৃশ্য উপায়ে। আপনি হয়ত প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছেন, কিন্তু গুলি বা রক্তপাত ছাড়াই? আসলে, আপনার বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস, ও চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে। এটাই পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ। আপনি হয়তো বুঝতেই পারছেন না, অথচ আপনি এই যুদ্ধের শিকার হয়ে পড়ছেন প্রতিদিন। এই যুদ্ধের নাম ‘পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ’ বা Fifth Generation Warfare।

সংক্ষিপ্তাকারে একে একে সকল প্রজন্মের যুদ্ধ নিয়ে কিছু বলা যাক। 

প্রথম প্রজন্মের যুদ্ধ (1st Generation Warfare)

প্রথম প্রজন্মের যুদ্ধ ছিল খুবই সোজাসাপ্টা ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির। এতে দুইটি সেনাবাহিনী সারিবদ্ধ হয়ে, সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করত। বন্দুক, তলোয়ার, বর্শা - এইসব ছিল প্রধান অস্ত্র। যুদ্ধের কৌশল ছিল শৃঙ্খলা ও সংখ্যায় এগিয়ে থাকা। এই যুগের যুদ্ধগুলো মূলত রাজতন্ত্রের মধ্যে সংঘটিত হতো। যেমন, নেপোলিয়নের যুদ্ধ বা ইউরোপের উপনিবেশিক যুদ্ধগুলো ছিল এই প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত।

 দ্বিতীয় প্রজন্মের যুদ্ধ (2nd Generation Warfare)

দ্বিতীয় প্রজন্মের যুদ্ধের সময়কাল জুড়ে দেখা যায় প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং গোলাবারুদের উপর নির্ভরতা। এতে ফায়ারপাওয়ার বা কামান, মেশিনগানের মতো অস্ত্র ব্যবহার করে দূর থেকে শত্রুকে ধ্বংস করা হতো। সৈন্যরা ট্রেঞ্চ বা খন্দকে লুকিয়ে যুদ্ধ করত। এই যুদ্ধগুলো অনেক সময় স্থবির, দীর্ঘস্থায়ী ও হতাহত বেশি হতো। যেমন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের যুদ্ধের আদর্শ উদাহরণ।

তৃতীয় প্রজন্মের যুদ্ধ (3rd Generation Warfare)

তৃতীয় প্রজন্মের যুদ্ধকে বলা হয় ‘চলনভিত্তিক যুদ্ধ’ (maneuver warfare)। এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল গতি, বিস্ময় ও পরিকল্পনা দিয়ে শত্রুর ঘাড়ে এসে পড়া, তাকে ঘিরে ফেলা। ফ্রন্টাল অ্যাটাকের বদলে পাশ থেকে আক্রমণ করা, বুদ্ধি দিয়ে যুদ্ধ জয় করাই ছিল কৌশল। ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, প্যারাট্রুপার—এইসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত এলাকা দখল করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির ব্লিট্‌জক্রিগ (Blitzkrieg) বা বিদ্যুৎগতির হামলা ছিল এই কৌশলের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

 চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ (4th Generation Warfare)

চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ অনেকটাই অন্যরকম। এটি আর শুধু রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়। বরং এখন যুদ্ধ হয় রাষ্ট্র বনাম বিদ্রোহী গোষ্ঠী, গেরিলা দল কিংবা সন্ত্রাসীদের মধ্যে। সরাসরি যুদ্ধের বদলে এখানে থাকে চোরাগোপ্তা হামলা, প্রচারযুদ্ধ এবং ধর্মীয় বা আদর্শিক লড়াই। মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের মানসিকতা প্রভাবিত করাও এর অংশ। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তানে তালেবান বা মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধের দৃষ্টান্ত।

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ (5th Generation Warfare)

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক, কারণ এটি চোখে দেখা যায় না। এর যুদ্ধক্ষেত্র হলো মানুষের মন এবং অস্ত্র হলো তথ্য, গুজব, ভুয়া সংবাদ, সোশ্যাল মিডিয়া, সংস্কৃতি, সিনেমা এমনকি জনপ্রিয় গানও। এখানে কেউ গুলি ছোঁড়ে না, বরং মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা ও মননকে ধ্বংস করা হয়। মানুষ নিজের ধর্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ে। এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে মানুষ নিজের অজান্তেই পরাজিত হয়। 

এই যুদ্ধের ভয়ঙ্কর দিক হলো, এখানে শত্রু কারা আপনি চেনেন না, গোলা-বারুদের পরিবর্তে ব্যবহার হয় তথ্য, আবেগ, গল্প আর বিভ্রান্তি। অর্থাৎ যুদ্ধ হচ্ছে আপনার মাথার ভেতরে - আপনার চিন্তা, অনুভূতি, ও বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। যেটা নোম চমস্কি তাঁর বহু বই ও বক্তৃতায় বলেছেন যে জনগণের চিন্তা ও মতামত নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ও কর্পোরেশনগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। বিশেষ করে তাঁর বই “Manufacturing Consent” এবং “Necessary Illusions” বইতে তিনি দেখিয়েছেন যে, মূলধারার মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, বিনোদন শিল্প, এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে সাধারণ মানুষ নির্দিষ্ট একটি ভাবনা, মতামত বা বিশ্বাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

ধরুন। আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেসবুক স্ক্রল করছেন। হঠাৎ একটি ভিডিও দেখলেন যেখানে বলা হচ্ছে, “এই দেশ শেষ, এই জাতি কিছুই করতে পারবে না।” আপনি হয়তো বিরক্ত হন, হয়তো উদ্বিগ্ন, কিন্তু বারবার এই ধরনের পোস্ট দেখলে একটা সময় আপনি নিজের অজান্তেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, আমরা অক্ষম, দুর্বল, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই। এটাই হচ্ছে Fifth Generation Warfare-এর প্রধান অস্ত্র: মনোবল ভেঙে দেওয়া। 

এখানে খুব পরিচিত একটি গল্প বলি, এক ব্যক্তি তার কাঁধে একটি ছাগল নিয়ে যাচ্ছিল। তিনজন দুষ্ট লোক ঠিক করল, তারা তাকে বিভ্রান্ত করবে। প্রথমজন বলল, “আপনি কাঁধে কুকুর নিয়ে ঘুরছেন?” সে পাত্তা দিল না। তবে কিছু একটা ভাবলো। পথিমধ্যে দ্বিতীয়জন বলল, “কালো কুকুর নিয়ে ঘুরছেন যে? ”এবার একটু সন্দেহ হলো নিজের উপর। আবার কিছুর যাওয়ার পর তৃতীয়জন বলল, “আপনি তো মানুষকে হাসাচ্ছেন! কুকুর নিয়ে ঘুরছেন আপনি।”

একই কথা বারবার শুনে মানুষটি নিজের চোখকেই সন্দেহ করতে লাগল এবং ছাগলটিকে কুকুর ভেবে ছেড়ে দিল।

সাইকোলজির ভাষায় এটাকে বলে Gaslighting বা মানসিক ও আবেগিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল যেখানে কাউকে বারবার ভুল তথ্য দিয়ে, সন্দেহ ঢুকিয়ে তার নিজের উপলব্ধি, স্মৃতি, বা বিচারবোধকে দুর্বল করে দেওয়া হয়। এমনভাবে যেন সে নিজেই নিজের বোধশক্তি নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করে।


সহজ করে বললে, Gaslighting এমন এক মানসিক খেলা, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যজনকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে, সে নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। নিজের বিশ্বাসকে ভুল হিসাবে গণ্য করতে থাকে।বারবার মিথ্যা কথা, অস্বীকার, বা অভিযোগ দিয়ে তাকে বোঝানো হয় যে সে ভুল দেখছে, ভুল মনে রাখছে বা অযথা চিন্তা করছে। এভাবে মিডিয়াগুলো বিভিন্ন ভুল তথ্য ও ভুল বিশ্বাস আমাদের মাঝে পুশ ইন করিয়ে বোকা বানাচ্ছে। 


এই যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হয়?

এই যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, নাটক-সিনেমা, এমনকি গানের কথাও। এসবের মাধ্যমে তৈরি হয় ভুল ধারণা, ভয়ের গল্প, বিভ্রান্তিকর বার্তা—যেগুলো আমাদের বিবেক্কে বোকা বানিয়ে ধোকা দিয়ে আমাদের আবেগ অনুভূতি ও বিশ্বাস নিয়ে খেলা করে। 

ধরুন, একজন জনপ্রিয় নায়ক বা ইউটিউবার বা  ফ্লুয়েন্সার হঠাৎ করে এমন কিছু প্রচার করল, যেটা ইতিহাস বিকৃত করে। আপনারা তাকে ভালোবাসেন এবং বিশ্বাসও করেন—তাই তার কথাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কিন্তু আপনি জানেন না, সে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বার্তা ছড়াচ্ছে, কিংবা তারও পেছনে কারও উদ্দেশ্য আছে বা কারও দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে বহুবার দেখা গেছে এই জিনিস। ধরুন, আমেরিকায় ২০১৬ সালের নির্বাচনের সময় রাশিয়া ফেসবুকে ভুয়া পেজ খুলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি ঘটেছে, প্রাণহানি পর্যন্ত হয়েছে।যেমন ২০১৮ সালে “ছেলেধরা” গুজবে দেশে কয়েকজন নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছিল।

এইভাবেই Fifth Generation Warfare আপনাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করে, যা আপনি স্বাভাবিকভাবে কখনো করতেন না।বা আপনার বিশ্বাসের পরিপন্থী এবং বিবেক বিবর্জিত বিষয়। 





কিভাবে এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন?


প্রথমত, ফিল্টার করতে শিখুন। 

ফিল্টার করা বলতে আখ যেমন মেশিনে মাড়িয়ে ছেকে শুধু রস গ্রহণ করা হয়। তেমনিভাবে সব ফিল্টার করুন, ছাকুন। বুঝুন যে সব খবর, পোস্ট, ভিডিও সত্য নয়। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “আমি এটা বিশ্বাস করলে কে লাভবান হবে?” ধরুন, আপনি ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখলেন যেখানে বলা হচ্ছে, “এই নেতা দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে।” সেটা শোনার পর মনের মধ্যে রাগ জমে। কিন্তু আপনি কি জানেন ভিডিওটির উৎস কী? সত্যি ঘটনা নাকি কোনো পক্ষের এজেন্ডা? যাচাই করুন, ভাবুন, তারপর বিশ্বাস করুন।


দ্বিতীয়ত, কিছু সময় নিজের ভেতরে ফিরে যান।

প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা মোবাইল, টিভি, ল্যাপটপ বন্ধ রাখুন। একা থাকুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন — আমি কে, আমি কী হতে চাই, আমি কী বিশ্বাস করি? আমি কোথায় যাব আমি আমার উদ্দেশ্য কি?  আমি কেন এখন এখানে? আপনাকে দার্শনিক হতে হবে বলছি না তবে, নিজেকে চিনুন জানুন। আপনার মধ্য থেকে আপনাকে খুঁজে আনুন। আর মন কি বলছে সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। সেই সুরটা বোঝার চেষ্টা করুন। যে সুরটা আপনি জন্মের সময় পেয়েছিলেন। যেই সুর আপনার সৃষ্টিকর্তার থেকে আসছে। যেই সুরে আছে বিশ্বাস এবং গন্তব্যের প্রতি এক অদৃশ্য টান আর অনাবিল প্রশান্তি। এই সুর আপনাকে শোনানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে আপনার পরমাত্মা।

এরপর জানুন নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে। আপনার সীমাবদ্ধতা কোথায় খুঁজে বের করুন। আপনার সোশ্যাল কমিটমেন্ট বা সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে চিন্তা করুন। আল্লাহর নেয়ামত অসহায় গরিব মিসকিনের মাঝে বন্টন করার উসিলা হিসেবে আপনাকে নির্বাচন করে পর্যাপ্ত অর্থ সম্পদের মালিক বানানো হয়েছে। তাতে আপনি কতটুকু শুকরিয়া আদায় করেছেন? অন্যান্য সামাজিক দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পেরেছেন, আর কতটুকু ব্যর্থ?আপনি কতটুকু আবেগ কন্ট্রোল করতে পারেন? আপনার নীতি-নৈতিকতা, বিশ্বাসের উপর কতটুকু দৃঢ় থাকতে পারেন? দেখুন। আপনি হয়তো গ্রীক দার্শনিকের ‘Know Thyself ‘ উক্তিটি অনেকবার শুনেছেন অথবা ইমাম গাজ্জালি এর নিচের বাণীটি পড়েছেন —নিজেকে বিচার (মুহাসাবা) না করলে তাজকিয়া সম্ভব নয়। সমাজ বদলাতে হলে আগে নিজেকে বদলাও। 


তৃতীয়ত, ভালো মানুষের সান্নিধ্যে থাকুন। এবং ভালো পরিবেশে থাকুন।


যারা সব সময় হতাশা ছড়ায়, নেতিবাচকতা ছড়ায়—তাদের এড়িয়ে চলুন। ধরুন, আপনাকে কেউ সব সময় বলে, “এই দেশ কখনো ভালো হবে না।” সে নিজেই বিশ্বাস হারিয়েছে, এখন আপনাকেও নিচে টানছে। এমন মানুষের বদলে নিজেকে ঘিরে রাখুন এমন কাউকে দিয়ে, যারা গঠনমূলক চিন্তা করে, যারা পজেটিভ চিন্তা করে। পজেটিভ ভাবে, পজিটিভ কাজ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মানুষ তার বন্ধুর ধর্মে হয়, তাই কাকে বন্ধু বানাচ্ছো, দেখো।” — (আবু দাউদ)

এই হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি, কার সঙ্গে চলছি তার প্রভাব আমাদের চিন্তা ও বিশ্বাসে পড়ে। আজকের ফিফথ জেনারেশন ওয়ারফেয়ার-এ যদি আমরা ভ্রান্ত ও বিভ্রান্ত সঙ্গের মধ্যে থাকি, আমাদেরও সেই মতবাদে ডুবে যাওয়া নিশ্চিত।

চতুর্থত, হাতে-কলমে কিছু করতে শিখুন। 

নিজের হাতে কাজ করার অভ্যাস শুধু দারুণ আত্মতৃপ্তির উৎস নয়, বরং এটি আত্মনির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। এই যুগে, যখন আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ডিজিটাল নির্ভরতা বাড়ছে, তখন হাতে-কলমে কিছু করতে পারা এক ধরনের শক্তি। ধরুন, আপনি নিজ হাতে নিজের ছাদের টবে সবজি চাষ করতে জানেন, কিংবা ছোটখাটো মেরামতের কাজ নিজেই করতে পারেন—তাহলে আপনি যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন।

আধুনিক সময়ে বাজারে যেসব খাবার পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় একটি অংশই স্বাস্থ্যহানিকর। হাইব্রিড বীজ, রাসায়নিক সার, ফরমালিন ও বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদানে ভরা খাদ্যপণ্য আমাদের শরীরের ক্ষতি করছে নীরবে। এর প্রভাবে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও হৃদরোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কিন্তু যারা নিজে খাবার উৎপাদন করতে জানেন, তারা অন্তত জানেন তারা কী খাচ্ছেন।

ইসলাম এই আত্মনির্ভরতার ব্যাপারটিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ হাতে কাজ করতেন। একটি হাদীসে তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তির খাওয়া’র সবচেয়ে উত্তম উপার্জন হলো যা সে নিজ হাতে উপার্জন করে।” (বুখারী)

তাঁর সাহাবারা অনেকেই নিজ হাতে খেজুর বাগান করতেন, খেজুরের রস সংগ্রহ করতেন, ইট টানতেন—যেমনটি আমরা দেখি মসজিদে নববীর নির্মাণের সময় রাসূল ﷺ নিজেও মাটি টানছিলেন। এতে বোঝা যায়, সম্মানজনক কাজ মানে শুধু অফিসে বসে কাজ নয়, বরং হাল চাষ করা, কাঠ কাটা, দর্জির কাজ করা, কিংবা নির্মাণশ্রমিক হওয়াও সম্মানের।

ইবনে খালদুন তার ‘মুকাদ্দিমা’ বইতে লিখেছেন, “শ্রম হলো সভ্যতার ভিত্তি। শ্রম না থাকলে জ্ঞান ও অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়।” তাই কেবল পড়ালেখা বা ডিজিটাল দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, হাতে কাজ করার অভ্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ‘গ্রিন লাইফস্টাইল’, ‘আরবান ফার্মিং’, ‘সাস্টেইনেবল লিভিং’ ইত্যাদি নিয়ে শহরাঞ্চলে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম বহু আগেই আমাদের শিখিয়েছে—আল্লাহর দেওয়া প্রকৃতি ও ফিতরাতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবন যাপন করাই মানুষের প্রকৃত শান্তির পথ।

নিজের হাতে তৈরি করা খাবার, নিজের হাতে বানানো জিনিস—এগুলো শুধু শরীর না, মনকেও সুস্থ রাখে। এটি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, পরিবারে প্রশান্তি আনে, এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের পথ তৈরি করে।

পঞ্চমত, বই পড়ুন - বিশেষ করে কুরআন, হাদীস ও ইসলামী ইতিহাস।

যদি আপনি সারাদিন শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে থাকেন, তাহলে আপনার চিন্তার ক্ষমতা ধীরে ধীরে অন্যদের হাতে চলে যাবে। আপনি যা দেখছেন, তাই বিশ্বাস করতে শিখবেন। কিন্তু বই পড়লে আপনি ভাবতে শিখবেন। নিজেকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হবে। আর এই চিন্তার সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে কুরআন এবং হাদীস।

কুরআন মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি চিন্তা করো না?” – এই প্রশ্নটি কুরআনে বহুবার এসেছে। মূসা (আ.) ফিরআউনের অন্যায় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কীভাবে সাহসের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন, ইউসুফ (আ.) কীভাবে কারাগারের অন্ধকারে থেকেও সত্য ও ন্যায়ের দাওয়াত দিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কীভাবে গোটা সমাজের চিন্তার ধারা বদলে দিয়েছেন। এসব গল্প শুধু কাহিনি নয়, এগুলো জীবনের জন্য পথনির্দেশনা।

এছাড়াও ইসলামী ইতিহাসের অনেক মহামানব আছেন। যেমন সালাহউদ্দিন আইয়ুবি, যিনি জেরুজালেম বিজয় করেছিলেন। উমর ইবন খাত্তাব (রা.), যিনি খিলাফতের সময় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অপরাজেয় বীর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এর জীবনী,ইমাম গাযালী, ইবনে তাইমিয়াহ ও ইবনে খালদুনের মত মনীষীরা জ্ঞানচর্চা এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পুরো সমাজের চিন্তা ও জ্ঞানের কাঠামো গড়ে দিয়েছেন। তাঁদের লেখা বইগুলো আজও মানুষকে সঠিক পথে চলার দিকনির্দেশনা দেয়।

ইমাম শাফী (রহ.) বলেছেন, “জ্ঞান একটি আলো, যা আল্লাহ যার অন্তরে চান, দেন।” তাই যদি আপনি সত্যিকারের স্বাধীন চিন্তা করতে চান, নিজের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ ধরে রাখতে চান, তাহলে বই পড়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বইই পারে আপনাকে ভেতর থেকে গড়ে তুলতে।

ষষ্ঠত, নিজের জীবনের গল্প নিজেই লিখুন।

আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ যেন কখনোই অন্য কারও হাতে না যায়। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজের জন্য নিচ্ছে ভেবে খুশি থাকে, অথচ তার বিশ্বাস, লক্ষ্য ও স্বপ্ন অনেক আগেই অন্য কারও হাতে প্রোগ্রাম হয়ে গেছে - হয় মিডিয়া, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, প্রতিটি মানুষই আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধি - যে নিজের জীবন ও আমানতের জন্য দায়বদ্ধ। আল্লাহ বলেন:  “প্রত্যেক মানুষের কাজ আমরা তার গ্রীবায় বেঁধে দিয়েছি।” (সুরা আল-ইসরা ১৭:১৩) হাদিসে আছে যে তাকদীর নির্ধারিত। তারমানে এই না যে অন্যজনের কাছে আপনার ভাগ্যের চাবিকাঠি দিয়ে দিবেন। আল্লাহ বলেন,  "নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।" (সূরা আর-রা'দ ১৩:১১)।

এবার ভাবুন আপনি কি করবেন?  আপনার ভাগ্যের কন্ট্রলিং অন্যজনের হাতে দিবেন কিনা? আরও সহজ করে বললে এমন হবে, আপনার জীবন কেমন হবে, তার দায়িত্ব আপনার নিজের। আপনি যদি আপনার লক্ষ্য লিখে রাখেন, প্রতিদিন নিজের উদ্দেশ্য মনে করিয়ে দেন, তাহলে দুনিয়ার বিভ্রান্তি আপনাকে সহজে টলাতে পারবে না।  

মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Self-Authoring। নিজের জীবনের গল্প নিজে পরিকল্পনা ও লিখে ফেলার প্রক্রিয়া। গবেষণা বলে, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্পষ্ট করে লেখে এবং তা অনুযায়ী পরিকল্পনা করে চলে, তারা মানসিকভাবে স্থিতিশীল থাকে এবং বড় ধরনের বিভ্রান্তি বা চাপ সামলাতে পারে।

ইতিহাসে আমরা দেখি, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ছোটবেলায় মুসলিম ভূমি মুক্ত করার স্বপ্ন লিখে রেখেছিলেন এবং সারা জীবন সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা ব্যবসায়ী হয়েও নিজের ইলম অর্জনের লক্ষ্য এত দৃঢ় করেছিলেন যে, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর ফিকহ বিশ্বে প্রচলিত।

রাসূল ﷺ নিজেও জীবনের প্রতিটি ধাপের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেছেন—মক্কার দাওয়াত, হিজরতের পরিকল্পনা, মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা—সবই ছিল লক্ষ্যভিত্তিক ও আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী।

নিজের জীবনের গল্প নিজে লিখতে গেলে তিনটি জিনিস জরুরি।

ক. স্পষ্ট উদ্দেশ্য: আপনি কেন বেঁচে আছেন, তা জানা।

খ. লক্ষ্যের সাথে আমল: শুধু স্বপ্ন নয়, প্রতিদিনের কাজে সেই লক্ষ্য প্রতিফলিত হওয়া।

গ. আত্মসমালোচনা (Muhasaba): নিজের কাজের ভুল-ত্রুটি বোঝা এবং ঠিক করা। 

যদি আপনি আপনার লক্ষ্য না ঠিক করেন, তবে নিশ্চিত থাকুন—কেউ না কেউ আপনার জন্য সেটা ঠিক করে দেবে, এবং তখন আপনি আপনার নিজের গল্পের প্রধান চরিত্র না হয়ে এক্সট্রা চরিত্রে পরিণত হবেন।


সপ্তমত, আপনি যাদের গল্প দেখেন বা যাদের ভালো লাগে, তারা যেন আপনার চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়।

ধরুন, আপনি যদি সব সময় এমন সিরিজ দেখেন যেখানে হিরো হচ্ছে একজন ঠগ, লোভী, খুনি বা প্রতারক বা কোনো নায়িকা নামে মেয়ের পিছনে ছুটে - তাহলে আপনি নিজের অজান্তেই সেই আচরণগুলোকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেন। তখন আপনি ভাববেন, সবাই তো এমনই করে। এবং নিজের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক বলে ধরে নিবেন। অথবা স্পাইডারম্যান, হাল্ক, থর ইত্যাদি অবাস্তব চরিত্রের উপর কেন আকৃষ্ট হন? এই রকম চরিত্রগুলো কি নিজের জীবনে বা সামাজিক জীবনে আপনার কোনো উপকার করেছে? নাকি এই চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে কারো কোনো উপকার করতে পেরেছেন? তাহলে কেন দেখবেন এইসব চরিত্র বা কেন আকৃষ্ট হবেন এসব অবাস্তব কিছুতে?

এটাই ভয়ঙ্কর। তার বদলে এমন চরিত্র খুঁজুন যাদের জীবন আপনাকে অনুপ্রাণিত করে। 


শেষ কথা

পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ হচ্ছে এমন একটি যুদ্ধ যা আপনি দেখতে পান না, কিন্তু প্রতিদিন আপনার মন, চিন্তা, আত্মবিশ্বাস - সবকিছুকে গ্রাস করে নেয়। এই যুদ্ধের শিকার আপনি, আমি, আমরা সবাই। কিন্তু আপনি চাইলে, আপনি এই যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে পারেন। দরকার সচেতনতা, জ্ঞান, সাহস এবং ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা। শেষে এই বার্তাগুলো মনে রাখুন,

ক. তথ্য যাচাই করুন: বিশ্বাস করার আগে প্রশ্ন করুন, কে লাভবান হচ্ছে?

খ. নীরবতা চর্চা করুন এবং নিজেকে চিনুন : প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা প্রযুক্তিমুক্ত সময় কাটান। 

গ. নিজেকে বুঝার চেষ্টা করুন। ভুল স্বীকার করে উন্নতির পথ ধরুন।

ঘ. ভালো সঙ্গ ও ভালো পরিবেশ বেছে নিন: বিভ্রান্তিকর, নেগেটিভ মাইন্ডের মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করুন।

ঙ. পাঠাভ্যাস গড়ে তুলুন: ইতিহাস, কোরআন, হাদীস ও সাহসী মানুষদের জীবন পড়ুন। যেকোনো নতুন জ্ঞান আহরণ করুন। প্রাক্টিক্যাল জ্ঞান অর্জন করুন। 


জেগে উঠুন। ভাবুন। এবং নিজের চিন্তাশক্তিকে আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র বানান।